প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব ব্যবস্থা

প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব ব্যবস্থা

(গত ১৪ মার্চ ২০২০ ফকিএররপুর জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত “কওমি মাদরাসার হিসাব পদ্ধতি কর্মশালা”য় প্রশিক্ষকদের প্রদত্ত আলোচনার নির্বাচিত অংশ)মাদরাসার সকল প্রাপ্তি হিসাবভুক্ত হবে মাদরাসার নামে ছাপানো রশিদের মাধ্যমে। আবার মাদরাসার সকল পরিশোধ হিসাবভুক্ত হবে মাদরাসার নামে ছাপানো ভাউচারের মাধ্যমে।

রশিদ

রশিদ দু’ধরণের ক. “দপ্তর রশিদ” বা “সাধারণ রশিদ” এবং খ. “রাফ রশিদ” বা “বিশেষায়িত রশিদ বা কুপুন”। সরাসরি হিসাবভুক্ত হবে দপ্তর রশিদ / সাধারণ রশিদ। রাফ রশিদ / বিশেষায়িত রশিদ সরাসরি হিসাবভুক্ত হবে না। বরং প্রথমে বিশেষায়িত রশিদের প্রাপ্তির সমষ্টি সাধারণ রশিদে উঠাতে হবে। অত:পর সাধারণ রশিদ থেকে হিসাব রেজিস্টারে উঠবে। বিশেষায়িত রশিদের প্রাপ্তি সাধারণ রশিদে উঠানোর ক্ষেত্রে বিশেষায়িত রশিদের উদ্ধৃতি (বিষয়ের নাম, বহি নম্বর) উল্লেখ করতে হবে। অডিট পর্যন্ত বা পরিচালনা কমিটির রেজুলেশন পর্যন্ত বিশেষায়িত রশিদ সংরক্ষণ করতে হবে।

বিশেষায়িত রশিদ বা কুপুন

রশিদের যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ভুল অনেক মাদরাসায় করে থাকে:

১. রশিদ ছাপানোর পূর্বে কমিটির মিটিংয়ের অনুমোদন নেয়া হয় না।
২. রশিদ ছাপানোর পর অনুমোদিত পরিমানের চেয়ে কম-বেশি হওয়ার পরিমান কমিটির মিটিংয়ে অনুমোদন করানো হয় না।
৩. ছাপানো রশিদের বিবরণ ” রশিদ বহি স্টক/মওজুদ রেজিস্টার”-এ লিপিবদ্ধ করা হয় না।
৪. রশিদ বহি ক্রম ধারা রক্ষা করে ব্যবহর করা হয় না। মাঝখানের এক/একাধিক নম্বরের বহি অব্যহৃত রেখেই পরের নম্বর ব্যবহার করা হয়।
৫. রশিদের নিচে কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর থাকে না।
৬. “রশিদ বহি বিতরণ রেজিস্টার”-এ ইস্যু না করেই রশিদ বহি ব্যবহার করা হয়।

কলামনার ক্যাশ বহিতে রশিদের প্রাপ্তি উঠানো:

রশিদের পৃষ্টা পৃষ্ঠা না তোলে বই বই করে তোলা। রশিদ বইয়ের শেষ পাতার পিছনে পুরো বহির যোগ টানা এভাবে-
ক. কোন খাতে কত নম্বর পৃষ্ঠা থেকে কত নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত মোট কত টাকা প্রাপ্তি হয়েছে।
খ. পুরো বহিতে সকল খাতে সর্বমোট কত টাকা প্রাপ্তি হয়েছে।
গ. সেই পৃষ্ঠাতে হিসাবর রক্ষকের স্বাক্ষর এবং তারিখ প্রদান করা। আর সেই তারিখ এবং কলামনার ক্যাশ বুকের তারিখ একই হতে হবে।
ঘ. পুরো বহির সকল খাতের সর্বমোট প্রাপ্তি টাকা কলামনার ক্যাশ বহির মোট টাকার ঘরে উঠাতে হবে।
ঙ. রশিদ বহির খাতওয়ারির মোট প্রাপ্তিসমূহ কলামনার ক্যাশ বহির খাতের কলামে উঠাতে হবে।এভাবে একটি পূর্ণ বহি ক্যাশ বহির একটি রো’তে (মোট ও খাতওয়ারি) দু’ভাবেই লিপিবদ্ধ হয়ে যাবে।

ভাউচার

ভাউচার ৩ প্রকার।

যথা:
১. দোকানী বা সেবাপ্রদানকারী প্রদত্ত ক্যাশমেমো।
২. মাদরাসার নামে ছাপানো ‘খরচের ভাউচার’।
৩. মাদরাসার নামে ছাপানো ‘সামারি ভাউচার’ শুধুমাত্র ‘সামারি ভাউচার’ অনুমোদিত হবে। ক্যাশমেমো এবং ‘খরচের ভাউচার’ অনুমোদিত হবে না। বরং এ দু’প্রকার ভাউচার ‘সাপোর্টিং ভাউচার’ হিসেবে সামারি ভাউচারের নিচে পিনাপ করা থাকবে।

ক্যাশমেমো

ক্যাশ মেমো সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা,

১. যে সকল পণ্যের বিক্রেতা বা সেবাপ্রদানকারী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ছাপানো ভাউচার প্রদান করে সে সকল পণ্য ও সেবার জন্য বিক্রেতা বা সেবাসংস্থার ছাপানো ক্যাশমেমো অপরিহার্য।
২. মাদরাসার নামে ছাপানো ‘খরচের ভাউচার’ এ সকল পণ্য ও সেবার জন্য গৃহীত হবে না।
৩. ক্যাশমেমোর ক্রেতার নাম, ঠিকানার ঘরে দোকানির বা সেবাদাতার দ্বারা মাদরাসার নাম, ঠিকানা লেখা থাকতে হবে। এ ঘর সাদা থাকলে অথবা মাদরাসার কারও দ্বারা লেখা থাকলে ক্যাশমেমো বাতিল হয়ে যাবে।
৪. ক্যাশমেমোর নিচে বিক্রেতার বা সেবাদাতার স্বাক্ষর থাকতে হবে। বিক্রেতার স্বাক্ষরমুক্ত ক্যাশমেমোও বাতিল হয়ে যাবে।
৫. ক্যাশমেমোতে যাতায়াত ভাড়া, গাড়ি ভাড়া মাদরাসার কারও দ্বারা সংযুক্ত করা যাবে না।
৬. মালামালগুলো কী কাজের জন্য ক্রয় করা হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ ক্যাশমেমোর কোন ফাঁকাস্থানে লিখে রাখা যাবে।
৭. ক্যাশমেমোতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ অনুমোদনের স্বাক্ষর ও সিল দিবে না।

খরচের ভাউচার

মাদরাসার নামে ছাপানো খরচের ভাউচার শুধুমাত্র ঐ সকল পণ্য ও সেবার জন্য ব্যবহৃত হবে যে সকল পণ্যের বিক্রেতা বা সেবাপ্রদানকারী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ছাপানো ক্যাশমেমো ক্রেতাকে বা সেবাগ্রহণকারীকে প্রদান করে না।

খরচের ভাউচারের উপরে ৩টি ঘর থাকবে। যথা:
ক. খাত
খ. ভাউচার নং
গ. খরচের তারিখ।

প্রতিটি খরচের ভাউচার খাতওয়ারি পৃথক পৃথক হবে। অর্থাৎ এক খাতের ভাউচারে অন্য খাতের খরচ লেখা যাবে না। খরচের ভাউচারে দু’টি তথ্য এতটাই স্পষ্ট হতে হবে যে, যেন তা বুঝার জন্য পরবর্তীতে জিজ্ঞেস করতে না হয়। ভাউচার নিজেই সকল প্রশ্নের উত্তর দিবে। যথা: ক. কেন এ খরচ করা হলো তা বিস্তরিত লেখতে হবে খ প্রতিটি পণ্যের পরিমাণ ও দর উল্লেখ করে মূল্য কত হলো তা লেখতে হবে। সেবাগ্রহণের জন্য খরচের ভাউচার লেখা হলে খরচের ভাউচারের নিচে বামে গ্রহীতার স্বাক্ষরের ঘরে সেবাদাতার স্বাক্ষর বা টিপসহি থাকতে হবে।পণ্য ক্রয়ের জন্য খরচের ভাউচার লেখা হলে খরচের ভাউচারের নিচে বামে মাদরাসার পক্ষ থেকে যিনি ক্রয় করেছেন তিনিই গ্রহীতার স্বাক্ষর দিবেন।খরচের ভাউচারের নিচের ডানে হিসাব রক্ষক স্বাক্ষর করবেন।খরচের ভাউচারে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ অনুমোদনের স্বাক্ষর ও সিল দিবে না।

সামারি ভাউচার বা টপসিট

সামারি ভাউচার বা টপসিট মাদরাসার নামে ছাপানো হবে। নিচে বামে হিসাব রক্ষক স্বাক্ষর করবেন এবং ডানে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের থেকে ভাউচার অনুমোদনের ক্ষমতা প্রাপ্ত ব্যক্তি স্বাক্ষর করবেন।সামারি ভাউচারের উপরে ভাউচার নং ও খরচের তারিখ থাকবে। উপরে খাত থাকবে না।সামারি ভাউচারের মধ্যভাগে ৩টি কলাম থাকবে। যথা: খরচের ভাউচার নং, খাত, টাকা। আর প্রয়োজন ও কাগজের মাপ অনুযায়ী কিছু রো’ থাকবে।একটি তারিখের মাত্র একটাই সামারি ভাউচার হবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট তারিখের যতগুলো খরচের ভাউচার ও ক্যাশমেমো আছে প্রথমেই তা খাতওয়ারি পৃথকভাবে সাজাতে হবে। অত:পর ১ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সবগুলোতে ক্রমিক নম্বর দিতে হবে। অত:পর সামারি ভাউচারের ‘খাতে’র কলামের প্রথম রো’তে খাতের নাম লিখে উক্ত খাতের সকল খরচের ভাউচার ও ক্যাশমেমোর ক্রমিক নম্বরগুলো সামারি ভাউচারের খরচের ‘ভাউচার নং’ কলামের প্রথম রো’তে লিখতে হবে। অত:পর উক্ত খাতের সকল খরচের ভাউচার ও ক্যাশমেমোগুলোর টাকা যোগ করে সামারি ভাউচারের ‘মোট টাকা’ কলামের প্রথম রো’তে লিখতে হবে। অত:পর এভাবে আরেকটি খাতের ভাউচারগুলো যোগকরে সামারিভাউচারে উঠাতে হবে। এতে নির্দিষ্ট তারিখের সকল খরচ খাতওয়ারি ভাবে একটা সামারি ভাউচারে চলে আসবে।সকল ‘খরচের ভাউচার’ ও ক্যাশমেমো প্রদত্ত ক্রমিক নং অনুযায়ী সাজিয়ে সামারি ভাউচারের নিচে পিনাপ করে দিতে হবে।সকল খাতের ‘টাকা’ যোগ করে সামারি ভাউচারের নিচে ‘সর্বমোটে’র ঘরে লিখতে হবে।সামারি ভাউচারের উপরে ভাউচার নং প্রদান করতে হবে। সামারি ভাউচারের উপরে প্রদত্ত ক্রমিক নং এবং তারিখ অনুযায়ী তা কলামনার ক্যাশ বহি ভুক্ত হবে।সামারি ভাউচারের সর্বমোট টাকা কলামনার ক্যাশ বহির মোট টাকার ঘরে উঠাতে হবে। আর সামারি ভাউচারের খাতওয়ারি টাকা কলামনার ক্যাশবহির খাতওয়ারি ঘরে উঠাতে হবে।(ক্যাশমেমো+খরচের ভাউচার)>সামারি ভাউচার>কলামনার ক্যাশ বহি

বিদ্যুৎ বিল

বিদ্যুৎ বিলের মূল কপি ভাউচার হবে না। তা আলাদা ফাইলে ক্রমধারা অনুযায়ী সংরক্ষণ করতে হবে। এর ফটোকপি সাপোর্টিং ভাউচার হবে।যাতায়াত ভাউচারইজমালিভাবে গৃহীত হবে না।যাতায়াতকারীদের সংখ্যা, নাম-পরিচয় এবং যাতায়াতের কারণ –এ ৩টি তথ্য বিস্তারিতভাবে যাতায়াত খাতের খরচের ভাউচারে উল্লেখ করতে হবে।যতায়াতের প্রতিটি রুটের প্রারম্ভ-গন্তব্য এবং সেটুকুর যানবাহনের নাম উল্লেখ করে প্রতিটি রুটের পৃথক পৃথক ভাড়া লেখতে হবে।যে সকল গণ পরিবহণ যাত্রীকে ছাপানো টিকিট প্রদান করে সে সকল যানবাহনের ছাপানো টিকিট সাপোর্টিং ভাউচার হিসেবে পিনাপ করতে হবে।

আপ্যায়ন ভাউচার

আপ্যায়ন ভউচারও ইজমালিভাবে গৃহীত হবে না। অতিথির নাম-পরিচয় ও সংখ্যা আপ্যায়ন খাতের খরচের ভাউচারে স্পষ্ট উল্লেখ করতে হবে।আপ্যায়নের প্রতিটি আইটেমের নাম, পরিমাণ, দর উল্লেখ করতে হবে।

2 thoughts on “প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব ব্যবস্থা”

  1. আবিদ রায়হান

    খুবই গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট, এটা জানা আমার খুবই দরকার ছিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *