বাস্তবতার কাঠগড়ায় ক্বওমী শিক্ষা

১। কওমি মাদরাসা নিয়ে মুরুব্বিরা অনেক সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করে আছি যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে বলে___সেগুলো আর কখনোই আলোর মুখ দেখে না। বহু বছর ধরে চুপ করে আছি। কিছুই বলিনা। কিছু সমালোচক আছেন, এগুলো নিতে পারেন না। সেজন্য চুপ করে থাকি। কিন্তু এখন দেখছি, আমি আর কত বছর বাঁচবো? আমার যা বলার আমাকে বলতেই হবে। আমি আজ যা বলতে চাচ্ছি তা আমার এক বন্ধুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে শুরু করছি। তিনি হচ্ছেন মোখলেছুর রহমান হাবিব। এখন কাতারপ্রবাসী। বেফাক বোর্ডের পরীক্ষায় তিনি এক নম্বর হয়েছিলেন। মাদরাসাতুল মদিনার শিক্ষক ছিলেন। আমরা একসঙ্গে একটি সমবায় সমিতিতে যুক্ত ছিলাম। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড করেছিলাম। তিনি খুব আক্ষেপের সঙ্গে আমাকে জানিয়েছিলেন___গালিব ভাই, প্রচলিত কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থায় আমার জীবনের ৭০ভাগ সময় নষ্ট হয়েছে। আমি তার এই মন্তব্যটি নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করেছি। তিনি একজন মেধাবী সচেতন তরুণ আলেম। কেনো তিনি এই মন্তব্য করলেন? তাঁর এই মন্তব্যের বাস্তবতা কতটুকু? পরে আমি দেখলাম যে আসলেই বাস্তবতা আছে। যেভাবে উর্দু-ফার্সি আর প্রাচীন কিতাবাদি… অবিন্যস্ত ও অবৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা তাতে সময় নষ্ট না হয়ে উপায় নেই। এখন পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। পাঠদান পদ্ধতি অনেক উন্নত হয়েছে। বই-পুস্তক অনেক আধুনিক হয়েছে। কিন্তু কওমি মাদরাসাগুলো সেই তিমিরেই রয়ে গেছে..

২. ১৪ বছর ধরে “এসো আরবী শিখি” কিতাবটি পড়াচ্ছি। আমি জানি যে এ কিতাবটির জন্যে প্রতিদিন তিনটি ক্লাস প্রয়োজন। এটি কিতাব রচয়িতার নিয়ম অনুযায়ী। কিন্ত… আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই কিতাবটি যে জমাতে পড়ানো হয় সে জামাতের ছাত্ররা আরবি ভাষার একটি কিতাব পাঠ করলেও ফার্সি ভাষার কিতাব পাঠ করে আন্তত চারটি। মোগলরা উপমহাদেশে শাসন করার সময় তাদের মাতৃভাষা সেইযে ফার্সি চালু করেছিলো তার রাহুগ্রাস থেকে এ উপমহাদেশ এখনো মুক্ত হতে পারেনি…

৩. আপনি দেখে আশ্চর্য হবেন কিংবা আপনি হয়তো আশ্চর্য হবেন না___কওমি মাদরাসার একজন ছাত্র হেদায়াতুন্নাহু জামাত থেকে প্রায় সব কিতাব আরবি ভাষার পেয়ে থাকে কিন্তু কিতাব বিভাগের প্রথম জামাতে সে আরবি শেখার জন্য একটি কিতাবও পায়না___অথচ কিতাব বিভাগের প্রথম জমাতে উর্দু ফার্সি কিতাব পাঠ্য তালিকায় রয়েছে অন্তত দশটি। একটি ছাত্র কওমি মাদরাসার প্রথম জামাতে পড়তে এসে উর্দু-ফার্সি-বাংলা-ইংরেজির জগাখিচুড়ি মার্কা অবস্থা দেখে প্রথমেই সে ভরকে যায়। আর সময় নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তো আছেই…

৪. অপ্রয়োজনীয়’ ভাষার বাড়াবাড়ি রকম প্রয়োগ, অবিন্যস্ত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পাঠ্যক্রম___আমি এটি বলতে চাচ্ছি বর্তমান সময়ের বিবেচনায়___বর্তমান প্রজন্মকে যুগ-চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যোগ্য করার পরিবর্তে বরং অযোগ্য করে তুলছে। এমন ব্যবস্থার কারণে না শিখছে তারা আরবি না ফার্সি না উর্দু না ইংরেজি না বাংলা অর্থাৎ কোনো ভাষায় দক্ষ হচ্ছে না। ফলে কোরআন হাদিস ঠিকমতো বুঝতে পারছে না। বোঝাতে পারছেনা। সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থা এমনই।

৫. কওমি মাদরাসায় কোনো টিসির ব্যবস্থা নেই। এক মাদরাসার ছাত্র ফেল করে, বহিষ্কৃত হয়ে অন্য মাদরাসায় অবলীলায় ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, কেউ চাইলে কয়েক জামাত উপরে গিয়ে ভর্তি হচ্ছে। এমনকি নাহবেমির-হেদায়াতুন্নাহু পড়ে মেশকাত-দাওরায় ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য ব্যাপার। এ বিষয়টির আমি সরাসরি প্রমাণ পেয়েছি।

৬. বড়ো বড়ো মাদরাসাগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার নামে একটি তামাশা অনুষ্ঠিত হয়। যে কাউকে সহজে ভর্তি করে নেওয়া হয়। ফ্রী খানা দেওয়া হয়। হাজার হাজার ছাত্র দাওরা জামাতে পড়ে কীভাবে যে জাতির সামনে চলে আসছে, ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। এসব আলেমরা ইসলামের বদনাম করছে। ধর্মের বারোটা বাজাচ্ছে। মুরুব্বিরা কি এগুলো নিয়েও ভাববেন? এগুলো বলছি কারণ এগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি। সরাসরি প্রমাণ পেয়েছি।

৭. কওমি মাদ্রাসা থেকে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে আজকে মুরুব্বীরা যেমন সচেতনতা দেখিয়েছেন আশা করবো বিক্ষিপ্তভাবে উপরে যে কয়টি কথা উল্লেখ করছি এগুলো নিয়ে তারা ভাববেন।

৮. তরুণ বন্ধুদেরকে আহবান করছি, চুপ করে থাকবেন না। আপনারাও লিখুন। বায়োবীয় বরকতের ধোঁয়ায় জাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আপনাদের মৌনতার কারণে। কয়েক শ’ বছরের পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থাকে জোর করে এখনো চালানো হচ্ছে যা কওমি জনগোষ্ঠীকে সামনে এগিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বরং পিছিয়ে দিচ্ছে। এর নজির গোটা বিশ্বে নেই। শুধু ভারত-বাংলাদেশ পাকিস্তানেই এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। যুগ-চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করে তাকওয়া-পরহেজগারির বিষয়টি নিশ্চিত করাসহ তা চালু করা না গেলে আগামীতে কপালে আরও দুর্গতি আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *